মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকে প্রায়শ সমাজ সেবা করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয়। সমাজ সেবা দান-খয়রাত বা সহানুভুতি থেকে শুরু করে মানুষের মর্যাদা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সমতা রক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত। জাতীয় সমাজ সেবা দিবস আমাদের মানবিক চেতনা মনে করিয়ে দেয় যা একটি সুস্থ, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের ভিত্তি।
সমাজ সেবা একটি দায়িত্ব, এটি শুধু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়, এর ভিতরে দারিদ্রতা হ্রাস,নারী ও শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা,প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী সুরক্ষা, সাস্থসেবা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্র একসাথে কাজ করলে সমাজের উন্নয়নের পথ সহজ হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সভ্যতার সংকট প্রবন্ধে বলেছেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। মানুষের এই বিশ্বাস সমাজ সেবার মূল জীবনীশক্তি।
মানুষের সম্ভাবনার উপর আস্থা রেখে তাকে স্বাবলম্বী করে তোলাই প্রকৃত সমাজ সেবা। মানুষের আত্মসম্মান ঠিক রেখে তাকে নিজের পায়ে দাড় করানোতে সাহায্য করতে পারলে সহায়তা কার্যকর হয়। জাতীয় সমাজসেবা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানব উন্নয়নও জরুরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন এবং প্রান্তিক জনগণের অন্তর্ভুক্তি সমাজ সেবার বাস্তব রূপ। এই ক্ষেত্রে সমাজকর্মীদের নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সমাজসেবার মূল লক্ষ্য সমতা প্রতিষ্ঠা করা। এখানে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সমাজসেবার আদর্শ। এই আদর্শ বাস্তবায়নে একইসাথে রাষ্ট্র, বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। তাইতো কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন,গাহি সাম্যের গান, যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাঁধা ব্যাবধান।
বর্তমানে প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহ সমাজ সেবাকে আরও কার্যকর করেছে। ডিজিটাল সেবা ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাজ কল্যাণ কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক স্পর্শ বজায় রাখা জরুরি। কেননা সমাজসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ, তার অনুভূতি, চাহিদা ও সম্ভাবনা।
মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, “The best way to find yourself is to lose yourself in the service of others.” অন্যের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত পরিচয় ও তৃপ্তি নিহিত। জাতীয় সমাজসেবা দিবস তাই কেবল একটি দিবস উদযাপন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকারের দিন। আমি সমাজের জন্য কী করছি, আর কী করতে পারি, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দিন।
তাই আসুন, আমরা সবাই মানবিক মূল্যবোধে দৃঢ় থাকার অঙ্গীকার করি। ছোট ছোট উদ্যোগ, সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীল আচরণই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। জাতীয় সমাজসেবা দিবসে সকল সমাজকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও মানবকল্যাণে নিয়োজিত মানুষের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। মানবতার পথে এই নিরলস যাত্রা অব্যাহত থাকুক, এই কামনাই আজকের দিনে আমাদের সকলের।
.jpg)